ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামা বিশ্লেষণ,
ভোটের মাঠে কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের দাপট, বেড়েছে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী: সুজন
- আপডেট সময় : ০৭:০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৯৯ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন,২০২৬ এ প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটের মাঠে কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের দাপট রয়েছে, আছেন ঋণগ্ৰস্তরাও। এবারে প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রার্থী উচ্চ শিক্ষিত। তবে প্রার্থীদের একটি বড় অংশ আয়কর বিবরণী দাখিল করেননি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
শনিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার।
সংবাদ সম্মেলনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীদের তথ্য তুলে ধরে সুজন জানায়, মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন প্রার্থী ঋণগ্রহীতা, যা শতকরা হিসাবে ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এদের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন ৭৫ জন প্রার্থী। ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বিএনপি। দলটির ১৬৭ জন প্রার্থী ঋণগ্রহীতা, যা মোট ঋণগ্রহীতার ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বলছে, টাকার পাহাড়ের নিচে সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীরা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এবারের নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীই কোটিপতি। বিশেষ করে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে বিত্তের প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এসব দলের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ২৭৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৫৫ জনই কোটিপতি, যা দলটির মোট প্রার্থীর অর্ধেকেরও বেশি (৫৬%)। একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির হারও কম নয়। এর বিপরীতে মাত্র ৫ শতাংশ প্রার্থীর সম্পদ ৫ লাখ টাকার নিচে।
আয়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত দেড় দশকে প্রার্থীদের বার্ষিক গড় আয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থীদের গড় আয় যেখানে ছিল ৩২.৫৯ লাখ টাকা, ২০২৬ সালে তা ফুলে-ফেঁপে দাঁড়িয়েছে ২.০১ কোটিতে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে। ২০০৮ সালের ১৯.৮১ লাখ টাকার গড় আয় বর্তমানে ৮৭.৬৪ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের গড় আয়ও এখন প্রায় ৯৩ লাখ টাকার কাছাকাছি।
সুজন জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আয়কর প্রদানকারী প্রার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তৃতীয় অবস্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এছাড়া ১৩২ জন প্রার্থী কেবল টিআইএন সনদ জমা দিয়েছেন, তবে আয়কর বিবরণী দাখিল করেননি।
আয়কর প্রদানকারী ১ হাজার ৩১৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৭৯ জন, অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রার্থী ৫ হাজার টাকা বা এর কম আয়কর দিয়েছেন। এক লাখ টাকার বেশি আয়কর দিয়েছেন ৩৫৮ জন (২৭ দশমিক ১৪ শতাংশ) এবং ১০ লাখ টাকার বেশি কর দিয়েছেন ১১৬ জন প্রার্থী, যা মোটের ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে আয়কর প্রদানকারী প্রার্থীর হার বেড়েছে। আগের নির্বাচনে এই হার ছিল ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা এবারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ১০ শতাংশে।
সুজন জানায়, ৭৪১ জন প্রার্থীর আয় ৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন ১৩২ জন এবং ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে আয় করেন ৭১ জন প্রার্থী। এছাড়া ১৫৫ জন প্রার্থী হলফনামায় আয়ের তথ্য উল্লেখ করেননি।
কোটি টাকার বেশি আয় করা প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৫১ জন। এরপর ২৫ জন স্বতন্ত্র এবং ৫ জন জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন।
শীর্ষ আয়কারীদের তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছেন কুমিল্লা–৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। তার বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে টাঙ্গাইল–১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম, যার আয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। প্রায় ১৯ কোটি টাকা আয় নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন লক্ষ্মীপুর–১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী।
তালিকায় আরও রয়েছেন বিএনপির মির্জা আব্বাস, স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীরসহ বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যাদের বার্ষিক আয় চার থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকার মধ্যে।
সুজন জানায়, শিক্ষাগত যোগ্যতায় এবারের প্রার্থীরা উজ্জ্বল হলেও (প্রায় ৭০ শতাংশ স্নাতক বা তদূর্ধ্ব) রাজনীতির এই ‘ব্যবসায়িকীকরণ’ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতি যখন ধনিক শ্রেণির করায়ত্ত হয়, তখন সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য মাঠ সংকুচিত হয়ে পড়ে। সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য এই আর্থিক বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ প্রমুখ।















