বড়লোক হওয়ার লোভে নিঃস্ব হাজারো মানুষ,
সারা দেশে সমাজকে গ্রাস করছে নতুন নেশা!
- আপডেট সময় : ১০:৪১:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ ২০৬ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে অনলাইন জুয়া বা গ্যাম্বলিং। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে বিদেশি ও দেশীয় চক্রগুলো তরুণ ও যুবসমাজকে এই আসক্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। সহজে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার প্রলোভনে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে। ভাঙ্গছে অনেক পরিবার।এমনকি টাকা ধার করে অনলাইন জুয়া খেলে হেরে গিয়ে পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে, চীন-নাইজেরিয়াসহ বিদেশি বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এসব জুয়া সাইট। দেশীয় এজেন্টের পাশাপাশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) কিছু অসাধু কর্মীও এর সঙ্গে জড়িত। তাদের হাত ধরে প্রতিদিন বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অভিযান চালিয়ে সাইট বন্ধ ও জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও দুর্বল আইন এবং মূল চক্র দেশের বাইরে থাকায় এই ডিজিটাল থাবা পুরোপুরি নির্মূল করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বা বলা যেতে পারে অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। ফেসবুক, ইউ টিউব খুললেই চোখ ধাঁধানো বাহারি বিজ্ঞাপন দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে এই অনলাইন জুয়া বা গাম্বলিং শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। যা আস্তে আস্তে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণ) সৈয়দ হারুন অর রশীদ ক্রাইম নিউজ প্রতিক্ষণকে বলেন, অনলাইন জুয়ার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমরা প্রতিনিয়ত সাইবার প্যাট্রোলিং অব্যাহত রেখেছি। জুয়াসহ অনলাইনকেন্দ্রিক যত ধরনের প্রতারণা রয়েছে সেগুলো প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে মানি লন্ডারিং জড়িত। কেননা জুয়ার টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তদন্তের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিংয়ের অংশটা আমাদের তফসিল ভুক্ত না হওয়াতে তদন্ত করতে পারছি না। মানি লন্ডারিং সিআইডি ছাড়া অন্য কেউ তদন্ত করতে পারে না। তবে যে হারে জুয়ার বিস্তার বাড়ছে সিআইডির একার পক্ষে সব তদন্ত করা সম্ভব নয়।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অনলাইন জুয়ার বহু ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপস দেদারসে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে চটকদার বিজ্ঞাপন। ওয়েবসাইটের মধ্যে বহুল পরিচিত-মেল বেট, মোস্ট বেট, ওয়ানএক্স বেট, টুয়েন্টি টু বেট, বেট উইনার ও জেটবাজ। এসব সাইটে স্পোর্টস, ক্যাসিনো, সল্ট গেম ও টেবিল গেম বেশি খেলা হয়। দেশে এসব অনলাইন জুয়ার বিস্তারের নেপথ্যে কাজ করছে বিদেশি নাগরিকরা। তাদের একটি অংশ বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে, আরেকটি অংশ দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে অবস্থান করে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশে অবস্থানকারীদের বেশির ভাগই চীন ও নাইজেরিয়ার নাগরিক।
নেতৃত্ব বৃদ্ধির আহ্বান বাংলাদেশের
এদিকে জুয়ার নিয়ন্ত্রক বিদেশি ওইসব নাগরিককে সহায়তা করছে বাংলাদেশি একাধিক চক্র; যারা এজেন্ট নামে পরিচিত। অনলাইন জুয়ার বাংলাদেশি এসব এজেন্ট ১৪ থেকে ২০ ভাগ কমিশন পেয়ে থাকে। অনলাইন জুয়ার এসব চক্রের কাছে অনেকটাই অসহায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তে খুব একটা সাফল্যও পাচ্ছে না তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা খুব বেশি ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে তারাই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত বা আগ্রহী হয়। এতে হার-জিত দুটোই আছে। তবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অনলাইন জুয়ার সফটওয়্যার এমনভাবে ডিজাইন করা, যার ফলে মাঝে মাঝে খেলোয়াড় জয়ের মুখ দেখে। তখন খেলোয়াড় মনে করে এর আগে যেটা লস করেছে সেটা এবার উসুল করে নেবে। কিন্তু জুয়া খেলার নিয়মটাই এমন থাকে বা এমনভাবে প্রলুব্ধ করা হয় যে, শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় লাভ নিয়ে বের হতে পারে না।
জানা গেছে, ১৩ মে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ছয় চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার ইউনিট। তাদের জিজ্ঞসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে বিকাশ ও নগদসহ অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির অসাধু কর্মীও জড়িত। এর মধ্যে নজরদারিতে আছে বেশ কয়েকজন। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। জুয়ার চারটি সাইট পরিচালনা করে দিনে দুই কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া এক চক্রের আট সদস্যকে ৬ মে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।
সিআইডি জানিয়েছে, ১ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পরিচালিত সাইবার প্যাট্রোলিংয়ে জুয়ার সঙ্গে জড়িত ওয়েবসাইট শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিতে ২৬৮টি ওয়েবসাইটের তথ্য দিয়েছে সিআইডি। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার লেনদেন করে এমন ৮৭৯ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ও বিভিন্ন ব্যাংকের ৪৩টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে এবং ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা বিভাগকে (বিএফআইইউতে) অনুরোধ জানিয়েছে সিআইডি।
সিআইডি প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) ডিআইজি আলি আকবর খান ক্রাইম নিউজ প্রতিক্ষণকে বলেন, সম্প্রতি অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেক সাইট আমরা বিটিআরসির মাধ্যমে বন্ধ করেছি। আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে অনলাইন জুয়া ইন্টারন্যাশনাল লিংকের অংশ। ফলে মূল জায়গায় হাত দেওয়া যাচ্ছে না। তবুও এটিকে সহনশীল পর্যায়ে কিভাবে নিয়ে আসা যায় সেই চেষ্টা করছি।














