অনলাইনে জুয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, ভাঙ্গছে অনেক পরিবার!
- আপডেট সময় : ০৩:২৭:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি:
বর্তমানে বাংলাদেশের নগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সব জায়গাতেই এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ও দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে শিক্ষার্থী, তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষ দিন দিন এই সর্বনাশা খেলায় জড়িয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, অন্যদিকে পরিবারগুলোতে বাড়ছে কলহ ও বিচ্ছেদ। আর বৃদ্ধি পাচ্ছে চুরি, ছিনতাইসহ মারাত্মক সব অপরাধ।
গত কয়েক বছরে ইন্টারনেটে শত শত অবৈধ বেটিং ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলোর তালিকায় রয়েছে ওয়ানইন্ট্রুবেট, বেটওয়ে, জেটবাজ. মেলবেট. গেসবাজি লাইভের মতো অ্যাপস। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার ও আকর্ষণীয় কিছু বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এসব প্ল্যাটফর্মে অবৈধ লেনদেন চালানো হচ্ছে। অধিকাংশ সাইট বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এর মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে।
শুরুতে কয়েকশো টাকা দিয়ে খেলা। কখনো অল্প কিছু টাকা জিতলেই মনে হয়, সহজেই আয় করা সম্ভব। কিন্তু হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় একপর্যায়ে বাড়তে থাকে বাজির পরিমাণ। ধার করা টাকা, পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কিংবা জমানো টাকা, এছাড়া টাকা না পাওয়া গেলে যখন তখন বন্ধুসহ নানা পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করে। সবই চলে যায় অনলাইন জুয়ার পেছনে। জুয়া-সংক্রান্ত প্লাটফর্মগুলোর নিজেদের সতর্কতামূলক তথ্যেও অর্থ ধার করা, সম্পদ বিক্রি করা, পরিবার ও পড়াশোনার দায়িত্বে সমস্যা এবং হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আবার খেলার প্রবণতাকে ঝুঁকির লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন ক্যাসিনোতে আসক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানায় গেল আট মাসে ৯৫ লাখ টাকা অনলাইনে জুয়া খেলে হারিয়েছেন। মাঝেমধ্যেই তিনি গলায় ফাঁস নেয়ার জন্য রশি টাঙ্গিয়ে রাখেন। বাড়িঘরেও নিয়মিত ভাঙচুর করেন। টেলিভিশন, ফ্রিজ, আসবাবপত্র সবকিছুই ভাঙচুর করেছেন- শুধু জুয়া খেলার টাকা না পেয়ে। এখন অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়।
উক্ত ভুক্তভোগী জুয়াড়ি আরও বলেন, আমার জীবন খুব কষ্টের। জুয়া খেলার জন্য আমার স্ত্রী সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এর আগে আমি ভালোভাবে কৃষিকাজ করতাম। স্থানীয় কিছু অনলাইন জুয়ার এজেন্টদের পাল্লায় পড়ে আমার সব শেষ। কিন্তু তারা এখনও আছে। সুখেশান্তিতে বসবাস করছে। পুলিশ তাদের ধরছে না। আমার মতো আরও অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
অভিভাবকরা বলছেন, টাকা জোগাড় করতে না পারলে উন্মাদের মত আচরণ করেন তাদের সন্তানেরা। হুমকি দেন আত্মহননের। অনেকে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে টাকা এনে দিয়েছেন সন্তানদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, আমার ছেলে আগে এমন ছিল না। কিছু বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে সে জুয়ায় ঢুকেছে। প্রথম প্রথম সে বলতো এখানে টাকা দিলে খুব তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়া যাবে। কিন্তু সে জেতার বদলে বেশি হেরেছে। কয়েকমাস পরে অবস্থা এমন হলো টাকার জন্য সে বাড়িঘরে ভাঙচুর করতে শুরু করলো। নিজের শখের বাইকও বিক্রি করে দিল। এখন সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে এনজিওর কাছে ঋণ আছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এজেন্ট ও অনলাইন জুয়া খেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে। গেল এক বছরে রাজশাহীতে অনলাইনে জুয়া খেলার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮০ জন। আর মামলা হয়েছে মাত্র ৩৫ টি।















