হৃদয় বিদারক ঘটনা,
রাজশাহীতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যা!
- আপডেট সময় : ০২:১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ১৩৯ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি :
মানুষ মানুষের জন্য ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গান আজ মিথ্যা হতে চলেছে। বর্তমানে একটি পরিবার অভাব সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।আমরা কি সত্যিই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে চলে গেছি।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এত অর্থ ও বিত্তশালী লোকজনের আধিক্যের মধ্যে কেউ কারো খোঁজ রাখে না।
রাজশাহীতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন স্বামী। ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুটও উদ্ধার করা হয়েছে। চিরকুটে লেখা আছে ঋণের দায়ে ও খাওয়ার অভাবে স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা এবং নিজে আত্মহত্যা করেছেন।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে জেলার পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রাম থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। মৃত চারজন হলেন- মিনারুল ইসলাম (৩৫), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (২৮), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলা (৩)। মাহিম খড়খড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বামনশিকড় পবা উপজেলায় হলেও এলাকাটি পড়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মতিহার থানায় আওতায়। মতিহার থানার পুলিশ মরদেহগুলো উদ্ধার করে। এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলামত সংগ্রহ করে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে স্ত্রী-সন্তানদের শ্বাসরোধে হত্যার পর মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে দেখা যায়, একটি ঘরের বিছানায় ছিল স্ত্রী মনিরা ও শিশুকন্যা মিথিলার মরদেহ। পাশের ঘরের বিছানায় ছিল মাহিমের লাশ। এ ঘরেই ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় মিনারুলের মরদেহ ঝুলছিল। ঘর থেকে দুটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। এটি মিনারুল লিখে গিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাতের লেখাটি মিনারুলেরই বলে স্বজনেরা পুলিশকে জানিয়েছেন।
চিরকুট দুটির প্রথম পাতায় লেখা আছে, ‘আমি মিনারুল নিচের যে সব লেখা লেখবো। সব আমার নিজের কথা লিখে যাচ্ছি। কারণ, আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাবো। এই মৃত্যুর জন্য কারো কোনো দোষ নেই। আমি মিনারুল প্রথমে আমার স্ত্রীকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিমকে (ছেলে) মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে (মেয়ে) মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছি।’
চিরকুটে আরও লেখা আছে, ‘আমাদের চারজনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার স্ত্রী-সন্তান না দেখে এবং বাপের বড় ছেলে যেন জানাজায় না আসে। আমাদের চারজনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা যেন টাকা না দেয়। এটা আমার কসম।’
চিরকুটের অপর পাতায় লেখা আছে, ‘আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম, কারণ আমি একা যদি মরে যাই তাহলে, আমার স্ত্রী-সন্তানরা কার আশায় বেঁচে থাকবে? কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমরা বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম সেই ভাল হলো। কারও কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমার জন্যে কাউকে মানুষের কাছে ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য অনেক মানুষের কাছে ছোট হয়েছে, আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। আমি চাই সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।’
পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ ক্রাইম নিউজ প্রতিক্ষণকে জানান, দুই দিন আগে মিনারুল তার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, তার ঘরে চাল নেই। তিনি দুই হাজার টাকা বের করে দিয়েছিলেন চাল কেনার জন্য। চেয়ারম্যান জানান, মিনারুল আগে থেকেই ঋণগ্রস্ত। বছর তিনেক আগে তারা এটা নিয়ে ছিলেন। তার বাবাকে অনুরোধ করিয়ে পাঁচ কাঠা জমি বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করান। কিন্তু পরে আবার কিস্তি নিয়েছিলেন মিনারুল। এলাকার লোকজন জানেন, মিনারুল জুয়া খেলতেন। এ কারণে দেনায় ফেঁসে যেতেন।
সকালে বাড়ির উঠানে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন স্বজনেরা। কাঁদতে কাঁদতে মিনারুলের মা বলছিলেন, ‘ও জান! এই কইরি গেলি ক্যানরে বাপ! আমি মাটি বেইচি আবার দিতুক রে জান। বাপের এক কাঠা পাইছি, ওডি বেইচি আবার দিতুক রে বাপ। আমার তো কিছুই থাইকল না।’
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান রাজশাহী নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, স্ত্রী ও মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো মনে হচ্ছে। মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। আরও তদন্তের পর আমরা প্রকৃত কারণটা জানতে পারব।
তিনি বলেন, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে। কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে সেটা ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে। আর জুয়ার বিষয়গুলো এখনো আমরা নিশ্চিত না। মিনারুলের এ রকম অভ্যাস ছিল কি না, সেটা আমরা জানি না। আত্মীয়স্বজন পুলিশকে বলেছেন, চিরকুটের লেখাটা মিনারুলেরই। সেখানে আর্থিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আমরা বিষয়গুলো তদন্ত করব।’















