কুমিল্লায় এক রাতে আটক ৬২৪ ‘কিশোর গ্যাং’ সদস্য
দাউদকান্দিতে থানা ভাঙচুর, ‘ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে গেল ২২ জন!
- আপডেট সময় : ১২:৩৮:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮৬ বার পড়া হয়েছে

কুমিল্লা ব্যুরো :
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েও থামছে না উঠতি বয়সি কিশোর-তরুণদের দৌরাত্ম্য। নগর থেকে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও যৌন হয়রানিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এরই মধ্যে বুধবার রাতে জেলার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ৪৫১ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। অপর ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদকসেবন, নিয়মিত মামলা, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বৃহস্পতিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে দাউদকান্দিতে সন্দেহভাজন ২৮ কিশোরকে আটকের পর থানায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠেছে, তাদের ২২ জন থানার একটি কক্ষের দরজা ও চেয়ার-টেবিল ভেঙে বেরিয়ে যায়। পরে রাত ১০টার দিকে থানার সামনে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেয় তারা। ২৮ কিশোরকে আটকের খবর পেয়ে তাদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন বিকাল থেকেই থানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে হট্টগোল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আটক কিশোরদের কয়েকজন একটি কক্ষের চেয়ার-টেবিল ও দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায়। পরে তাদের একটি অংশ থানার সামনে জড়ো হয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় স্বজনদের হট্টগোলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকদের দাবি, আটক কিশোরদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত রেকর্ডে কোনো অভিযোগ নেই।
দাউদকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরার কারণে সন্দেহভাজন হিসাবে ২৮ জনকে আটক করা হয়েছিল। স্বজনরা একসঙ্গে আসায় কিছুটা ভিড় হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ২২ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে বাকি ছয়জনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুলিশি অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সদস্যদের ভাষ্য, আটক সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণেই তাদের আটক করে থানায় আনা হয়েছিল।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের অফিশিয়াল পেজে জানানো হয়েছে, জেলার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হয়। নগরীর বিভিন্ন স্থানসহ প্রতিটি থানা এলাকার বখাটেদের উৎপাত রয়েছে-এমন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। এতে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি অংশ নেন। অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। আটকদের আগের কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
লাকসামে বুধবার সন্ধ্যার পর প্রায় তিন ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে কিশোর ও তরুণসহ ৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। রাতের বেলায় সড়ক ও অলিগলিতে অকারণে আড্ডা দেওয়া, মোটরসাইকেল নিয়ে সন্দেহজনকভাবে চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও লাকসাম পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। কয়েকজনকে মোবাইল ফোনে গেমস খেলা অবস্থায়ও আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
লাকসাম থানার ওসি কাজী কামরুন নাহার লাইলি জানান, আটক ৫১ জনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই ও তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণে ৪৬ জনকে আটক করেছে সদর দক্ষিণ থানা পুলিশ। ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম জানান, যাচাই-বাছাই করে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হচ্ছে।
তিতাসে সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরার অভিযোগে ২৩ কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ১২ জন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী হওয়ায় যাচাই-বাছাই করে রাতেই অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ জনকে ১৫১ ধারায় আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তিতাস থানার ওসি (তদন্ত) মফিজ উদ্দিন বলেন, অপরাধপ্রবণতা কমানো, শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে ঘোরাফেরা বন্ধ এবং অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে পুলিশ সুপারের নির্দেশে এ অভিযান চালানো হয়েছে।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান বলেন, কিশোর গ্যাং এখন সামাজিক বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। গ্যাং কালচার দমনে পুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে।















